টানা পতনেও দুর্বল শেয়ারে ‘কারসাজি’

শেয়ারবাজারে টানা দরপতনেও কারসাজি থেমে নেই। কম মূলধনী ও অস্তিত্বহীন কম্পানির দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। ‘জেড’ ক্যাটাগরির বেশির ভাগ কম্পানির শেয়ারের সংখ্যা কম। তাই এসব কম্পানির শেয়ার নিয়ে কারসাজি সহজ।

তাই এগুলো নিয়ে তৎপর কারসাজি চক্র। চক্রটি বিভিন্ন গুজব ছড়িয়ে এই কম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম বাড়ায়।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার নানা পদক্ষেপের মধ্যেও কম মূলধনী ও জেড ক্যাটাগরির শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাবিয়ে তুলেছে।

বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, টানা তিন কার্যদিবসের দরপতনে ডিএসইর প্রধান মূল্য সূচক কমেছে ১২৪ পয়েন্ট। গতকাল ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ৮ পয়েন্ট কমে ৬ হাজার ৯১৭ পয়েন্টে নেমেছে। দরপতনের দিনে ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে ৯০৮ কোটি ৮২ টাকা, যা চলতি বছরের ২ জানুয়ারির পর সর্বনিম্ন। ২ জানুয়ারি ডিএসইতে ৮৯৪ কোটি ১৭ লাখ টাকার লেনদেন হয়।

জেড ক্যাটাগরিতে উল্লম্ফন : ‘জেড’ ক্যাটাগরির ২৮টি কম্পানির মধ্যে অভিহিত মূল্যের পাঁচ গুণের বেশি দাম রয়েছে পাঁচটি কম্পানির। এর মধ্যে সাভার রিফ্র্যাক্টরিজ ১৯ গুণ (১৮৭ টাকা), জিলবাংলা সুগার ১৫ গুণ (১৩৯ টাকা), জুট স্পিনার্স ১২ গুণ (১২০ টাকা), শ্যামপুর সুগার আট গুণ (৮১.৭০ টাকা) এবং উসমানিয়া গ্লাসের দাম ছয় গুণ (৬১.৯০ টাকা)। সাম্প্রতিককালে এসব শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। এ ছাড়া দুর্বল মৌল ভিত্তির শেয়ারের মধ্যে দুলামিয়া কটন, বিচ হ্যাচারি, এমারেল্ড অয়েল, ইমাম বাটন ও অলটেক্সের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে।

অলটেক্সের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি
বস্ত্র খাতের কম্পানি অলটেক্স দীর্ঘদিন অভিহিত মূল্যের নিচে ছিল। এই কম্পানির কারখানাও বন্ধ। কিন্তু এই শেয়ারেরই দর হঠাৎ করে অস্বাভাবিক হারে বাড়তে থাকে। গতকাল এই শেয়ার সর্বশেষ লেনদের হয় ২৬.৬০ টাকায়। গত ৬ জানুয়ারি এই কম্পানির শেয়ারদর ছিল ৮.৭০ টাকা।

১৯৯৬ সালে তালিকাভুক্ত কম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান ২.২৮ টাকা। কম্পানিটি দীর্ঘদিন কারখানা বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি চালুর ঘোষণা দিয়েছিল। কয়েক দফা দামে অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে শেয়ারের দাম বৃদ্ধির কারণ জানতে চাওয়া হয়। কম্পানির পক্ষ থেকে কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই বলে জানানো হয়।

ভালো কম্পানির দাম পড়ছেই
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, অব্যাহত দরপতনে ‘এ’ ক্যাটাগরির ২৬৫টি কম্পানির মধ্য ৩২টি (১২ শতাংশ) কম্পানির মূল্য নেমেছে অভিহিত মূল্য অর্থাৎ ১০ টাকার নিচে। ‘বি’ ক্যাটাগরির ৮৫টি কম্পানির মধ্য ৯টি (১০.৫ শতাংশ) কম্পানির মূল্য রয়েছে অভিহিত মূল্য অর্থাৎ ১০ টাকার নিচে।

দুর্বল বা স্বল্প মূলধনী কম্পানি খ্যাত ‘জেড’ ক্যাটাগরির শেয়ারের দামে উল্লম্ফনে কারসাজি দেখছেন বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। জানতে চাইলে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুঁজিবাজারে মানুষ দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করবে কম্পানির ব্যবসা দেখে। কিন্তু এখন যা চলছে, তা এক ধরনের জুয়া। ১০ বছর যাবৎ বন্ধ কম্পানির শেয়ারের দামও বাড়ছে। বছরখানেক আগে ইনস্যুরেন্স খাত নিয়ে কারসাজি হয়েছে। এখন কারসাজির হাতিয়ার হিসেবে ছোট ছোট কম্পানি বেছে নেওয়া হচ্ছে। কারসাজির সঙ্গে জড়িতরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ ব্রোকারেজ হাউসে তাদের এজেন্টদের মাধ্যমে টাকা দ্বিগুণ করার প্রলোভন দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের ফাঁদে ফেলছে। ’

সর্বোচ্চ দরেও বিক্রেতাশূন্য ছয় কম্পানির শেয়ার : দরপতনের দিনেও লেনদেনের প্রথম ভাগে গতকাল দুর্বল মৌল ভিত্তির ছয় কম্পানির শেয়ার বিক্রেতাশূন্য হয়ে পড়ে। কম্পানি পাঁচটি হলো এডিএন টেলিকম, এপেক্স স্পিনিং, ড্রাগন সোয়েটার, মেঘনাপেট, মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক এবং ইস্টার্ন লুব্রিক্যান্টস। আগের দিনও দুর্বল ছয় কম্পানির শেয়ার বিক্রেতাশূন্য ছিল। কম্পানি ছয়টি হলো সমতা লেদার, জিকিউ বলপেন, হাক্কানী পাল্প, এপেক্স স্পিনিং, ইস্টার্ন লুব্রিক্যান্টস।

অস্তিত্বহীন চার কম্পানির বিনিয়োগকারীর তথ্য তলব : অস্তিত্বহীন বাংলাদেশ ডায়িং অ্যান্ড ফিনিশিং ইন্ডাস্ট্রিজ, মার্ক বাংলাদেশ শিল্প অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, প্যারাগন লেদার অ্যান্ড ফুটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিজ ও তৃপ্তি ইন্ডাস্ট্রিজের বিষয়ে অনুসন্ধানে নেমেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এসব কম্পানির অস্তিত্ব নেই। কারখানা কোথায়, এদের মালিক কারা—এর স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই। এসব কম্পানিতে যাঁদের বিনিয়োগ আছে, তাঁদের খুঁজে বের করা হচ্ছে। এর মধ্যে তৃপ্তি ইন্ডাস্ট্রিজ ২০০৮ সালে অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজের সঙ্গে একীভূত হয়েছিল। তবে তৃপ্তির বিনিয়োগকারীরা তাঁদের বিনিয়োগ ফিরে পেয়েছেন কি না, তা যাচাইয়ের উদ্যোগও নেওয়া হবে।

এই পরিস্থিতিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা যাতে ফের বিপদে না পড়েন, সে জন্য তাঁদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। তাঁরা বলছেন, অতিরিক্ত মুনাফার আশায় তাঁদের দুর্বল মৌল ভিত্তির ‘জেড’ ক্যাটাগরির শেয়ারে বিনিয়োগ করা উচিত হবে না। এতে মুনাফার বদলে উল্টো লোকসানের ফাঁদে পড়ার প্রবল ঝুঁকি থাকে।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক মাহমুদ ওসমান ইমাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গুজবনির্ভর বাজারের গতি-প্রকৃতি দেখে মনে হচ্ছে কারসাজি হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নজরদারি জোরদার করতে হবে, আরো কঠোর হতে হবে। ’

জানতে চাইলে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের সার্ভেইল্যান্স ও মার্কেট ইন্টেলিজেন্স বিভাগ সব সময় পুঁজিবাজারকে নজরদারিতে রাখে। এই কার্যক্রম আরো জোরদার করা হয়েছে। বাজারে কোনো ধরনের ইনসাইডার ট্রেডিং, কারসাজির বিষয় নজরদারি করা হচ্ছে। অভিযোগ পেলেই অনুসন্ধান করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ’

Education Template

AllEscort