ইউক্রেন সঙ্কট: সেনা ও বিদ্রোহীদের হামলা-পাল্টা হামলা

ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলভিত্তিক রুশপন্থিরা অভিযোগ করেছে, সরকারি বাহিনী তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। বৃহস্পতিবার তারা জানায়, পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় তাদের ভূখণ্ডে চারবার মর্টারের গোলা নিক্ষেপ করেছে সরকারি বাহিনীগুলো।

এদিকে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী বলেছে, লুহানস্ক অঞ্চলের একটি কিন্ডার গার্টেনে বিদ্রোহীদের ছোড়া কামানের গোলা আঘাত হেনেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমারা রুশ সেনা প্রত্যাহারের দাবিকে মিথ্যা আখ্যা দিয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে ন্যাটো প্রশ্নে অনমনীয় হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে কিয়েভ।

ইউক্রেন বলতে চাইছে, ন্যাটো জোটে যোগ দেওয়া তাদের কাছে ‘স্বাধীনতা’ পাওয়ার মতো ব্যাপার। ন্যাটোর পক্ষ থেকেও ইউক্রেনকে জোটভুক্ত করার প্রবল ইচ্ছের ইঙ্গিত মিলেছে। তবে ক্রেমলিন বলছে, ন্যাটো তাদের সীমা লঙ্ঘন করছে। নিবিড়ভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। যেকোনো সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে।

সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে রুশপন্থিদের হামলার অভিযোগ
রাশিয়ার সমর্থনপুষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ২০১৪ সাল থেকে পূর্ব ইউক্রেনের বিশাল একটি অংশ দখল করে আছে। এখন তাদের সঙ্গে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর বহু বছরের পুরনো সংঘাত ফের নতুন করে উজ্জীবিত হয়ে উঠেছে। স্বঘোষিত লুহানস্ক পিপলস রিপাবলিকের প্রতিনিধিরা এক বিবৃতিতে সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে গোলাগুলির অভিযোগটি তুলেছেন।

তারা জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার চারটি পৃথক হামলার ঘটনায় ইউক্রেনীয় বাহিনীগুলো মর্টার, গ্রেনেড লঞ্চার ও মেশিনগান ব্যবহার করেছে। ‘ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীগুলো ভারী অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করে অশোভনভাবে যুদ্ধবিরতি ব্যবস্থা লঙ্ঘন করেছে, মিনস্ক সমঝোতা অনুযায়ী এগুলো প্রত্যাহার করা উচিত,’ বিবৃতিতে বলেছে রুশপন্থিরা।

একটি আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনাটি কতটা গুরুতর ছিল তাৎক্ষণিকভাবে তা পরিষ্কার হয়নি এবং ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণরত অর্গানাইজেশন ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড কো-অপারেশন ইন ইউরোপ (ওএসসিই)-এর কাছ থেকেও তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি ওএসসিই ইউক্রেন থেকে তাদের কিছু পর্যবেক্ষককে প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

পাল্টা অভিযোগ সরকারি বাহিনীর
হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী পাল্টা অভিযোগ করেছে, বিদ্রোহীরাই সামরিক বাহিনীর ওপর গোলাবর্ষণ করেছে। বৃহস্পতিবার ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে রুশ-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ছোড়া কামানের গোলা ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের লুহানস্ক অঞ্চলে আঘাত হেনেছে বলে দাবি করেছে কিয়েভ।
ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী বলেছে, লুহানস্ক অঞ্চলের একটি কিন্ডার গার্টেনে বিদ্রোহীদের ছোড়া কামানের গোলা আঘাত হানলেও এতে কোনো হতাহত হয়নি।

রাশিয়া যেকোনো দিন ইউক্রেনে হামলা চালাতে পারে বলে পশ্চিমারা যখন তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, সেই সময় ইউক্রেনের স্বঘোষিত লুহানস্ক পিপলস রিপাবলিকের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ওপর হামলার এই অভিযোগ এলো।

হামলার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি। তবে উভয়পক্ষ পাল্টাপাল্টি অস্ত্রবিরতি লঙ্ঘন করেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে; যা গত প্রায় ৮ বছর ধরে চলে এসেছে।

বাড়ছে উদ্বেগ, রুশ সেনা প্রত্যাহারের দাবিকে মিথ্যা বলছে পশ্চিমারা
ইউক্রেনের সীমান্তজুড়ে রাশিয়ার ১ লাখের বেশি সৈন্য মোতায়েন রাখার এই সময়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী ও ইউক্রেনীয় সৈন্যদের পাল্টাপাল্টি গোলাবারুদ নিক্ষেপের ঘটনায় ব্যাপক উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। যদিও মস্কো ইউক্রেনে হামলা পরিকল্পনার অভিযোগ বরাবরের মতো অস্বীকার করেছে। রাশিয়া চলতি সপ্তাহে ইউক্রেন সীমান্ত থেকে কিছু সৈন্য প্রত্যাহার শুরুর ঘোষণা দিলেও পশ্চিমারা বলছে, তারা সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার কোনো লক্ষণ দেখতে পায়নি। উত্তর ইউরোপের দেশ এস্তোনিয়া দাবি করেছে, ইউক্রেনের ‘মূল ভূখণ্ড’ দখলে সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যে রুশ যুদ্ধবাহিনীগুলো অগ্রসর হচ্ছে। প্রকাশ্যে দেওয় বিরল এক বিবৃতিতে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা প্রধান বলেছেন, ইউক্রেন সীমান্তের কাছে আরও অনেক সাঁজোয়া যান, হেলিকপ্টার ও ফিল্ড হাসপাতাল দেখা গেছে।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইউক্রেন সীমান্তে আরও প্রায় ৭ হাজার রুশ সেনাকে আনা হয়েছে, এর অনেকেই বুধবার এসেছেন- কোনো তথ্যপ্রমাণ না দিয়েই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ দাবি করেছেন।

স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী প্রভাব বিস্তার এবং জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে ঠোকাঠুকি চলায় কয়েক দশকের মধ্যে পূর্ব-পশ্চিম সম্পর্ক নিয়ে সবচেয়ে জটিল সঙ্কটে জড়িয়ে পড়েছে বিশ্ব শক্তিগুলো।

ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে নমনীয় না হওয়ার ইঙ্গিত ইউক্রেনের

রাশিয়ার চাওয়া, তার প্রতিবেশী ইউক্রেন যেন ন্যাটো জোটে যোগ না দেয়। তবে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির জেলেনস্কি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে কোনো আপস তারা করবে না। এই সামরিক জোটকে তারা ‘নিরাপত্তার নিশ্চয়তা’ হিসেবে দেখছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটা ইউক্রেনের উচ্চাভিলাষ নয়। আমরা ১৫ হাজার মানুষ হারিয়েছি। এটা কোনো উচ্চাভিলাষ নয়, এটা আমাদের জীবনের প্রশ্ন।’

জেলেনস্কি বলেন, ‘প্রশ্নটা ন্যাটোর নয়। এটা আমাদের নাগরিকদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার প্রশ্ন। ন্যাটো প্রশ্ন আমাদের কাছে সদস্যপদ পাওয়ার প্রশ্ন নয়। আমরা যখন ন্যাটো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা আমাদের দখল হয়ে যাওয়া অঞ্চলের কথা বলি, তখন আসলে আমরা আমাদের স্বাধীনতার কথা বলি।’

ন্যাটো বলছে, জোটে যোগ দেওয়া ইউক্রেনের অধিকার
ন্যাটোর মহাসচিব জেনস স্টোলটেনবার্গ বলছেন, এই সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার অধিকার রয়েছে ইউক্রেনের। ‘আমরা এমন একটা প্রভাবের যুগ ফিরে আনতে পারি না, যেখানে পরাশক্তিরা অন্যদেরকে হুমকি দেয়, ভয় দেখায় কিংবা দাদাগিরি করে।’ মস্কোকে উত্তেজনা নিরসনের তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা যখন রাশিয়ার আক্রমণাত্মক কর্মকাণ্ড দেখি, তখন ন্যাটোকে তো প্রতিক্রিয়া জানাতেই হবে।’

মস্কোর হুমকি, ন্যাটোর বিরুদ্ধে সীমা লঙ্ঘনের অভিযোগ
রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ অভিযোগ করেছেন, সেনা বাড়ানোর যে অভিযোগ রাশিয়ার বিরুদ্ধে আনা হচ্ছে, আসলে সেই কাজটা ন্যাটোই করছে (সেনা বাড়ানো)।

তার মতে, ন্যাটো তার মন্তব্যের মধ্য দিয়ে ইতোমধ্যেই সীমা লঙ্ঘন করেছে। এদিকে ক্রেমলিনের একজন মুখপাত্র বলেছেন, ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার সীমান্তের কাছাকাছি পরিস্থিতি যেকোনো সময় জ্বলে উঠতে পারে।

দিমিত্রি পেসকভ সাংবাদিকদের বলেন, ‘যেকোনো মুহূর্তে পরিস্থিতি এমন পরিণতির দিকে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা আমাদের সীমান্তের কাছাকাছি যুদ্ধের নতুন সূত্রপাত ঘটাবে।’ ক্রেমলিন বলেছে যে, ইউক্রেনের বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত ডনবাস অঞ্চলে সহিংসতার খবরে তারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

Education Template

AllEscort