তিন দিনেও গ্রেপ্তার হয়নি ইউপি নির্বাচনে অস্ত্রধারীরা

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার খাগরিয়া ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে অস্ত্রবাজিতে জড়িত আরও দুজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। এ নিয়ে ৯ অস্ত্রধারীর ৮ জন চিহ্নিত হলেন। তাঁদের মধ্যে সাতজন নৌকার প্রার্থী মো. আকতার হোসেনের অনুসারী। অপরজন স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. জসিম উদ্দিনের পক্ষের। তবে ভোট গ্রহণকালে অস্ত্রবাজির ঘটনার তিন দিন পরও পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

পরিচয় শনাক্ত হওয়া অস্ত্রধারীরা ভোটের আগেই নিজেদের ফেসবুকে হুমকি-ধমকি দিয়ে স্ট্যাটাস দেন।

সোমবার সাতকানিয়ার ১৬ ইউনিয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। অন্তত ছয়টি ইউনিয়নে বড় ধরনের গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। নলুয়া ইউনিয়নে সহিংসতায় স্কুলছাত্র মো. তাসিব ও বাজালিয়া ইউনিয়নে আবদুস শুক্কুর নামের এক বহিরাগত নিহত হন। তবে সবচেয়ে বেশি গোলাগুলি হয় খাগরিয়া ইউনিয়নে নৌকার আকতার হোসেন ও স্বতন্ত্র জসিম উদ্দিনের সমর্থকদের মধ্যে।

খাগরিয়া গনিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র ও ৭ নম্বর ইউনিয়ন পরিষদ কেন্দ্রকে ঘিরে দুই পক্ষের মধ্যে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে গোলাগুলি হয়। এ ঘটনায় কেন্দ্র দুটিতে ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়। গনিপাড়া কেন্দ্র থেকে ছিনতাই হয় ব্যালটও। গোলাগুলিতে লিপ্ত দুই পক্ষের সাত অস্ত্রধারীর ছবি মঙ্গলবার প্রথম আলোয় প্রকাশিত হয়।

এর আগে শনাক্ত অস্ত্রধারীরা হলেন মো. নাছির উদ্দিন, মো. কামরুল আলম আজাদ ওরফে সুমন, মো. শাখাওয়াত ওরফে শওকত, মো. এজাহার, মো. কায়েস ও মো. আবছার। স্থানীয় একাধিক সূত্রমতে, শেষজন স্বতন্ত্র প্রার্থী জসিম উদ্দিনের অনুসারী। বাকিরা আকতার হোসেনের। গতকাল প্রথম আলোর প্রতিবেদনে কায়েসকে জসিম উদ্দিনের সমর্থক উল্লেখ করা হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে তিনি আকতারের ভাই। নির্বাচনে তাঁর পক্ষে ছিলেন।

আকতার ২০১৭ সালে প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তখনকার চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিনকে পরাজিত করে। আকতার বর্তমানে উপজেলা আওয়ামী লীগের শ্রমবিষয়ক সম্পাদক। জসিম উদ্দিন ২০১১ সালে প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তখন তিনি এলডিপির সমর্থক ছিলেন বলে প্রচার রয়েছে।

অস্ত্রধারীরা তাঁর অনুসারী নন বলে দাবি করেছেন আকতার হোসেন। তিনি বলেন, তাঁর অনুসারীদের হাতে অস্ত্র ছিল না। জসিম অস্ত্রবাজি করেছেন।

ফোন বন্ধ থাকায় অভিযোগের বিষয়ে জসীমের বক্তব্য নেওয়া যায়নি।

শনাক্ত আরও দুজন

গতকাল বুধবার নতুন করে আরও দুজন অবৈধ অস্ত্রধারীর পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন মোহাম্মদ নিশান ও জয়নাল আবেদিন ওরফে লেদু ডাকাত। মোহাম্মদ নিশান খাগরিয়া ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মাইজপাড়া বাদশা মিয়া বাড়ির মো. টিপুর ছেলে। ভোট চলাকালে গনিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের পাশের রাস্তায় অস্ত্র নিয়ে প্রতিপক্ষের দিকে গুলি ছুড়তে দেখা যায় নিশানকে।

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার খাগরিয়া ইউপি নির্বাচন চলাকালে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অস্ত্র হাতে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। গতকাল সোমবার খাগরিয়া গনিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের পাশের কৃষিজমিতে

জয়নাল আবেদিন ওরফে লেদু ডাকাত ৭ নম্বর আমিরখিল ওয়ার্ডের মাইজপাড়ার বাসিন্দা। পিতার নাম সাচ্ছু মিয়া। জয়নাল আবেদিন নির্বাচনের দিন লুঙ্গি পরিহিত অবস্থায় বিলের মধ্যে অস্ত্র হাতে দৌড়াচ্ছিলেন। জয়নাল খাগরিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার আমিনুল ইসলাম হত্যা মামলায় কারাগারে ছিলেন। আমিনুলকে ২০০৫ সালে গুলি করে হত্যা করা হয়।

ভোটের আগেই ‘খেলা হবে’ ঘোষণা

অস্ত্রধারী কয়েকজন ভোটের দিন সহিংসতা হবে এমন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন নিজেদের ফেসবুকে। ছাত্রলীগের সাতকানিয়া থানার কর্মী পরিচয় দেওয়া মোহাম্মদ নিশান ভোটের আগের দিন রোববার রাত ১১টা ৫২ মিনিটে ফেসবুকে লেখেন, ‘…দলের জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে দিলাম। বেঁচে থাকলে আবারও দেখা হবে রাজপথে।’

পরদিন সকালে অস্ত্র হাতে নেমে পড়েন তিনি। গত ৫ জানুয়ারি প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে হাসি ও ভি চিহ্নের ইমোজি দিয়ে ফেসবুকে নিশান লেখেন, ‘আমাকে নাকি ভোট সেন্টারে পেলে ডাইরেক্ট গুলি করবে? ভাইজান আমরা কিন্তু পুরান খেলোয়াড় মনে রাখবা…ইনশা আল্লাহ দেখা হচ্ছে ভোটের মাঠে।’

কামরুল আলম আজাদ ওরফে সুমন ২৪ জানুয়ারি ফেসবুকে লেখেন, ‘পাগলের পাগলামি দেখে ছাগলগুলো নাচতেছে, তা দেখে আমার খুব ভালো লাগতেছে…রাখে আল্লাহ মারে কে।’

মো. কায়েস ফেসবুকে ২৬ জানুয়ারি হুমকি দিয়ে লিখেছেন, ‘ফেসবুকে গলাবাজি না করে সামনাসামনি বাজারে আয় খেলা হবে।’

অস্ত্রধারী গ্রেপ্তার নেই

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় খাগরিয়া থেকে একটি এলজিসহ জসিম উদ্দিন নামের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে তিনি নির্বাচনী সহিংসতায় যুক্ত ছিলেন কি না, জানা যায়নি। এ ছাড়া খাগরিয়া থেকে আরও চার-পাঁচজনকে আটক করার কথা জানায় পুলিশ। তাঁদের মধ্যে অস্ত্রধারী কেউ আছে কি না, যাচাই-বাছাই চলছে বলে দাবি করেন সাতকানিয়া থানার ওসি আবদুল জলিল।

গতকাল পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক মো. জাকির হোসেন খান সাতকানিয়ার খাগরিয়া, নলুয়া ও বাজালিয়া ইউনিয়ন পরিদর্শন করেন। জাকির হোসেন খান বলেন, অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। সবাইকে গ্রেপ্তার করা হবে। তিনি বলেন, দুই খুনের ঘটনায় মামলা হবে। মারামারির ঘটনায় জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।

নলুয়ায় কিশোর তাসিব নিহত হওয়ার ঘটনায় গতকাল সাতকানিয়া থানায় মামলা হয়েছে। তাসিবের বাবা জসিম উদ্দিন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন।

অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তার না হওয়াকে পুলিশের গাফিলতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম জেলার সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, যেখানে পত্রিকায় ছবি ছাপা হয়েছে, নাম-পরিচয় বেরিয়েছে, সেখানে পুলিশ এখনো তাঁদের খুঁজে বের করতে পারছে না, এটা হতে পারে না। নাকি ইচ্ছা করে ধরা হচ্ছে না, সেটাও দেখতে হবে।

তবে র‍্যাব-৭ সাতকানিয়ার খাগরিয়া থেকে তিনজনকে আটক করেছে বলে তাদের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে। তাদের মধ্যে একজনের নাম জামাল উদ্দিন (৫০)। তিনি অস্ত্র ব্যবসায়ী বলে র‍্যাব জানিয়েছে।

বাজালিয়ার খুনের ঘটনায় মামলা হয়নি

সোমবার ভোট চলাকালে বাজালিয়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের কেন্দ্রে গুলিতে আবদুস শুক্কুর নামের এক ব্যক্তি নিহত হন। তিনি নৌকার প্রার্থী তাপস কান্তি দত্তের অনুসারী। তাঁর পক্ষে ভোট করার জন্য নগরের শুলকবহরের বাসিন্দা শুক্কুর সাতকানিয়ায় গিয়েছিলেন।

তাপস দত্ত এ ঘটনার জন্য আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী শহীদুল্লাহ চৌধুরীকে দায়ী করেন। এই ঘটনায় এখনো মামলা হয়নি।

Education Template

AllEscort